বাংলাদেশে বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার বাজার এবং বিপুল সংখ্যক রোগীর বিদেশে যাওয়ার প্রবণতাকে কাজে লাগাতে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে তুরস্ক। তুরস্কের ওকান ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল তাদের মেডিকেল ট্যুরিজম পার্টনার ‘টার্কিশডক’-এর মাধ্যমে এই বিশেষায়িত আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) হাসপাতাল স্থাপন করবে। এর মূল লক্ষ্য হলো—বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যাওয়া ঠেকানো এবং উন্নত প্রযুক্তি বাংলাদেশে নিয়ে আসা।
বিনিয়োগের প্রেক্ষাপট ও অর্থনৈতিক সুযোগ
বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারিভাবে বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার জন্য কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই। যদিও বেসরকারি খাতে ২৫টির মতো আইভিএফ সেন্টার গড়ে উঠেছে, তবুও উন্নত চিকিৎসা এবং আস্থার অভাবে অধিকাংশ ভুক্তভোগী দম্পতি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, সিঙ্গাপুর এবং সম্প্রতি তুরস্কে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন।
- বিশাল অর্থের বহির্গমন: প্রতি বছর ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে যায়, যার একটি বড় অংশ বন্ধ্যত্বজনিত সমস্যার সমাধান পেতে যায়। এই চিকিৎসায় একজন রোগীর পেছনে খরচ হয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা, যার ফলে প্রতি বছর বিপুল অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।
- তুরস্কের আকর্ষণ: টার্কিশডকের তথ্যমতে, বাংলাদেশিরা সিঙ্গাপুরে যে খরচে চিকিৎসা নেন, তার তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কম খরচে তুরস্ক সর্বোচ্চ মানের সেবা দিচ্ছে। তুরস্কে থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতসহ মোট খরচ প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যে থাকে। গত বছর থেকে টার্কিশডকের মাধ্যমে দেড় শতাধিক রোগীর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা নিতে তুরস্কে গেছেন।
প্রকল্পের বিস্তারিত ও আর্থিক কাঠামো
টার্কিশডক সূত্র অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই হাসপাতালটি নির্মাণে আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এ বিনিয়োগে তুরস্কের দুটি বেসরকারি কোম্পানি নীতিগতভাবে আগ্রহী হয়েছে।
- বাস্তবায়ন ও সময়সীমা: তুরস্ক সরকারের অনুমোদিত একমাত্র মেডিকেল ট্যুরিজম কোম্পানি টার্কিশডক এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করবে। অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামী বছরের শেষের দিকে হাসপাতালটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
- প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ স্থানান্তর: চালুর পর কমপক্ষে প্রথম দুই বছর তুরস্কের অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা বাংলাদেশে কাজ করবেন। তারা হাতেকলমে প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশি চিকিৎসকদের কাছে স্থানান্তর করবেন। এরপর হাসপাতালটি পুরোপুরি বাংলাদেশি চিকিৎসকদের দ্বারা পরিচালিত হবে।
- ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ: এই আইভিএফ সেন্টার সফল হলে ভবিষ্যতে বোনম্যারো ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের মতো অত্যন্ত জটিল রোগের চিকিৎসাও বাংলাদেশে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
- স্থানীয় অংশগ্রহণ: টার্কিশডক বাংলাদেশি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে এই বিনিয়োগে অংশ নিতে আগ্রহী হলে স্বাগত জানাবে বলে জানিয়েছে।
মানদণ্ড ও প্রযুক্তিগত সুবিধা
টার্কিশডকের প্রধান নির্বাহী ফাইক গকসু জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য কেবল চিকিৎসা প্রদান নয়, বরং কৌশলগত অংশীদার হিসেবে জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উচ্চ নৈতিক মানদণ্ড বাংলাদেশে স্থানান্তর করা।
- উন্নত সফলতার হার: তুরস্কে তাদের আইভিএফ প্রোটোকলে সফলতার হার ৭০ শতাংশের বেশি এবং তা ইসলামিক চিকিৎসা নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- আধুনিক মানদণ্ড: তাদের লক্ষ্য হলো তুরস্কের বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ‘জিরো ইনফেকশন সার্জিক্যাল মডেল’ বাংলাদেশে প্রয়োগ করা।
- প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা: এই হাসপাতালটি যৌথ রেফারেন্স সেন্টার হিসেবে কাজ করবে। তুর্কি ও বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা একসাথে কাজ করবেন। এছাড়াও, বাংলাদেশের চিকিৎসকদের তুরস্কে প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়ার সুযোগও তৈরি করা হবে।
টার্কিশডকের কান্ট্রি হেড এম নুরুজ্জামান রাজু মনে করেন, যেহেতু তারা মেডিকেল ট্যুরিজম শুরু করেছেন, তাই কী পরিমাণ বাংলাদেশি দেশের বাইরে যাচ্ছেন তার তথ্য-উপাত্ত তাদের কাছে রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশে এই বিনিয়োগ সহজ হবে এবং দেশের অর্থ দেশেই থাকবে।